এক্সক্লুসিভ *বৈমানিকের পান্ডুলিপি*১০*জোহান্সবার্গ থেকে প্রীটোরিয়া ও রেবেকা কাহিনী * রেহমান রুদ্র।।

19
265


জোহান্সবার্গ থেকে প্রীটোরিয়া ও রেবেকা কাহিনী।

শুরুতেই বলতে চাই আজকের এ ঘটনা যুক্তি তর্ক দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। এর বিচার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শুধু সময়ের অপচয় হয়েছে। ঘটনা কিভাবে ঘটলো তাই লিখছি। নির্দ্বিধায় বলতে পারি এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুরটাই ব্যর্থ হয়েছি। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির চারতলাতে এক নতুন কাপল এসেছিল। স্বামী স্ত্রী আর দেড় বছরের এক ছেলে। খোলা ব্যালকনিতে মায়ের কোলে খেলতে গিয়ে বাচ্চাটি চারতলা থেকে সরাসরি নিচে পড়ে যায়। সিঁড়িতে পায়ের শব্দের সাথে মায়ের কান্না আর অন্যদের হৈচৈ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। আশ্চর্যের বিষয় হছে সবাই যখন নিচে নেমে এল দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলাম সেই দেড় বছরের শিশুটি মাটিতে বসে খেলছে। একটি দাগ পর্যন্ত তার শরীরে নেই একদম সুন্দর ফুটফুটে শিশু। কিছুই হয়নি। এ ঘটনা দীর্ঘদিন পুরো এলাকায় মানুষের মুখে মুখে ছিল।

আজ যা সবার সাথে শেয়ার করতে যাচ্ছি তা সাউথ আফ্রিকার বিখ্যাত সিটি জহান্সবরগ থেকে কাছাকাছি এক শহরের ঘটনা। সাউথ আফ্রিকাতে আমরা এভিএশনে কর্মরত অনেকেই এসেছি একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করার জন্য। নানা জাতি ও নানা দেশের অনেকেই এক সাথে হয়েছিলাম সেমিনার উপলক্ষে। যেদিন ওখানে পৌঁছুলাম এয়ারপোর্টেই একজন অরগানাইযার বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে দিল। হোটেলে যখন এলাম তখন আয়োজকদের অন্য এক গ্রুপ আমাদের সব কারিকুলাম ধরিয়ে দিল। প্ল্যান ছিল যেমন করেই হউক এখানকার বিখ্যাত এপারটেড মিউজিয়ামে যেতে হবে। এই মিউজিয়ামে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত ওদের ভেতরে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বর্ণবাদ বৈষম্য ছিল তার অনেক নিদর্শন যত্ন করে রাখা আছে। এসব দেখার জন্য মানুষের আগ্রহের সীমা নেই।

আমার গ্রুপে সাউথ আফ্রিকার একটি মেয়ে ছিল। রেবেকা। সবার সাথে পরিচয় পর্বে ওর সাথে পরিচয়। সে বলল তার জীবনের অনেক কটা বছর এখানেই কেটেছে। বর্তমানে বাহরাইনে কর্মরত। হাইস্কুল আর কলেজের সময়টা এখানেই পার করেছে। ক্যারিকুলামের প্রথম দিন সাউথ আফ্রিকার আকর্ষণীয় দিকগুলো নিয়ে ওদের প্রেজেন্টেশন ছিল। এরপর গালা ডিনার। এগুলো সব প্রি প্রোগ্রাম করা। কথা প্রসঙ্গে রেবেকা বলল কাল অফ ডে। পরশু থেকে সেমিনার শুরু। বেশ কিছুদিন পরে এখানে এসেছে বিধায় ব্যাংকের অনেক কাজ পড়ে আছে। ওকে যেতে হবে তাই বলছে আমি যেন সাথে থাকি। একটা জিনিস বলে রাখা ভাল এখানকার শহর এলাকায় অনেক জায়গা আছে যেখানে ক্রাইম রেট বেশি। সিটি পুলিশ ওসব এলাকায় বড় ব্যানার আর বিলবোর্ড লাগিয়ে রেখেছে। লেখা থাকে ক্রাইম এরিয়া। নিরাপত্তার ভার নিজে নিয়ে এসব এলাকায় চলাফেরা করতে হয়। বেশ দূর থেকেই বিলবোর্ড দেখা যায়। এর আগে বেশ কবার এখানে এসেছি। তখন এসব দেখেছিলাম। একা যাওয়া সমিচিন নয়। ভাবছিলাম হয়ত এ কারনে রেবেকা তার সাথে ব্যাঙ্কে যেতে বলছে।

রাজি হয়ে গেলাম। সাথে এও বললাম সে যেন আমাকে এপারটেড মিউজিয়ামে নিয়ে যায়। লোকাল কেউ সাথে থাকলে গাইডের প্রয়োজন হয়না। অনেক কিছু হয়ত সহজে জেনে নিতে পারবো। রেবেকা রাজি হল। বলল ব্যাঙ্কের কাজ শেষে ওখানে চলে যেতে পারব। সকালে যথারীতি উবার ডেকে ব্যাঙ্কে চলে গেলাম। দূর থেকে দেখা যায় সে ক্রাইম এরিয়া লেখা বিলবোর্ড। শহরের মাঝে এসব দেখলে কেমন যেন একটা ফিলিং হয়।

রেবেকা যখন ব্যাঙ্কে ঢুকল আমি পাশের এক দোকানে গেলাম। এখানে বহু বছর আগে ভারতীয় মানুষজন এসেছিল। অনেকেই ব্যবসা নিয়ে আছে। এ দোকানটি ওদের। আবায়া টুপি তসবি নেকাব জায়নামায এসব বিক্রি করছে। হাজার মাইল দূরে এসে এসবের দোকান দেখতে পেয়ে ভালই লাগলো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যারা ভ্রমন করে ওরা বুঝবে আমি কি বলতে চাচ্ছি।

রেবেকার কাজ শেষ। ও জানালো কাছেই একটা রেস্টুরেন্ট আছে। খাবার পিক করে হোটেল লাউঞ্জে বসে খেয়ে নেয়া যাবে। তারপর ওখান থেকে এপারটেড মিউজিয়ামে যাবার প্ল্যান। রেস্টুরেন্টটি বেশ ফেমাস। কাষ্টমারের অভাব নেই। এখানে সবাই বিফের পাগল। সাউথ আফ্রিকান বিফের যথেষ্ট সুনাম আছে। এরা সম্পূর্ণ ফ্রি রেঞ্জ গরু উৎপাদন করে। বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় খোলামেলা পরিবেশে গরুগুলো বড় হয়। একবার এক রেস্টুরেন্টে একজনের সাথে এ বিষয়ে আলাপ হয়েছিল। আনুমানিক তিন বছর বয়সের গরু জবাই দেয়। গড়ে তখন ওজন ১৮০ কিংবা ১৯০ কেজির মতো হয়। রেবেকা বলল এই রেস্টুরেন্টের বিফ আর চিকেন আইটেম দারুন মজা। অনেক রকমের সালাদ সাথে দেয় যা কিনা বেশ স্বাস্থ্যকর। জনপ্রিয়তার কারনে সবসময় লাইন লেগে থাকে। যা বলা তাই কাজ। খাবার পিক করে হোটেলে এলাম। সেমিনারের বিশাল গ্রুপ আমরা। হোটেল বিযনেস এর জন্য এটা বেশ প্রফিটের বিষয়। তাই খাতির যত্নের অভাব নেই। এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জটা আমদেরকে ব্যাবহার করার জন্য দিয়ে দিয়েছে। চা কফি সব ধরনের ড্রিংকস স্নেক্স সব কিছুই আছে। বিকাল পাঁচটা থেকে সাতটা হ্যাপি আওয়ার। তখন লাউঞ্জ একদম জমজমাট। ড্রিংকস এর ছড়াছড়ি। এই সময়টায় লাউঞ্জ একদম খালি। কেউ নেই। ওখানে বসে খেয়ে নিলাম। রেবেকা ড্রেস পাল্টাতে রুমে চলে গেল। আমিও তাই করলাম। হোটেল থেকেই ক্যাব এরেঞ্জ করে দিল। একেবারে সরাসরি এপারটেড মিউজিয়ামে চলে এলাম।

# লিডার নেলসন ম্যানডেলা।। #

এই মিউজিয়ামে না এলে জানা হতোনা এদের এক সময় স্কিনের কালার নিয়ে কি আশ্চর্য বৈষম্য ছিল। বিশ্বখ্যাত লিডার নেলসন ম্যানডেলার জীবন সংক্রান্ত অনেক সৃতি এখানে যত্ন করে রাখা। মেইন গেইট দিয়ে ঢোকার আগেই একটা বেঞ্চ রাখা দেখলাম। ওখানে লেখা আছে কোন বিশেষ বর্ণের মানুষ এই বেঞ্চে বসতে পারবে। অন্যদের জন্য নিষেধ। আর এই বেঞ্ছ মিউজিয়ামের একটা আইটেম যা ইচ্ছে করেই বাইরে রেখেছে যেন ঢোকার মুখে মানসিক এক আবেগের আবহ তৈরি হয়। মেইন গেইটে একিই ব্যাপার দেখলাম। এক বর্ণের মানুষের জন্য এক লাইন ও প্রবেশদ্বার আর অন্য বর্ণের জন্য আলাদা লাইন। ভেতরে ঢুকেই অবাক হলাম। অনেক গুলো ফাসির দড়ি ঝুলিয়ে রাখা। কিছুদুর যেতেই দেখি আইসলেসন চেম্বার। একদম ছোট বক্সের মতো ঘর যেখানে বিশেষ কয়েদীদের রাখা হত। সাইজ এতই ছোট যে ভাবাই যায়না কি করে এখানে মানুষকে দিনের পর দিন রেখে দেয়া হত। চিন্তার ধারাবাহিকতায় বর্ণনা দেয়া মুস্কিল। এই মিউজিয়ামে দেখার মত অনেক কিছুই আছে। অনায়াসে তিন চার ঘণ্টা পার করে দেয়া যাবে।

# আইসলেসন চেম্বার।। #

অনেক কিছুই দেখা হল। হোটেলে ফিরে আসার জন্য ট্যাক্সির অপেক্ষা করছি। রেবেকা বলল তুমি আজ অনেক ফেভার করলে। আর এক্টু হেল্প কর। প্রিটরিয়াতে আমার দাদু থাকে। ওখানে যেতে চাই। বেশিক্ষন লাগবেনা। ট্রেনে করে গেলে আধঘণ্টায় পৌঁছে যাবো। কিছুজিনিস আছে ওগুলো পিক করতে চাই,। অনেকদিন পরে জোহানসবার্গে এলাম। বুঝতেই পারছ কতকিছু মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশিক্ষন লাগবেনা। কাজ সেরেই চলে আসব। কাল থেকে তো আবার সেমিনার শুরু হতে যাচ্ছে। ব্যস্ত হয়ে যাব তাই আজকে যেতে পারলে সুবিধা হয়। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা গেলনা। নতুন জায়গা দেখতে কার না ইচ্ছা করে। এর আগে ক্যাপিটেল সিটি প্রিটরিয়া যাইনি। সাউথ আফ্রিকার তিনটি ক্যাপিটাল সিটি। অন্য দুটো হচ্ছে কেপটাউন ও ব্লমফনটিন। ট্যাক্সি করে সরাসরি ম্যানডেলা স্কয়ারে চলে এলাম। এটা স্যানডটন এলাকায়। এখানে রয়েছে শপিংমল হোটেল আর অনেক ধরনের রেস্টুরেন্ট। এর মধ্যেই খোলামেলা যায়গায় ন্যালসন মেন্ডেলার বিশাল এক ভাস্কর্য। এলাকাটি বেশ সিকিউরড। সাদা পোশাকে বহু পুলিশ ঘুরছে। মুখের অভিব্যক্তি দেখলেই বুঝা যায়। এখানেই ট্রেন ষ্টেশন।

# ফাসির দড়ি ।। #

টিকেট কেটে ট্রেনে উঠে পড়লাম। স্বল্প সময়ের যাত্রা। এর মধ্যেই কথা হচ্ছিল। রেবেকা আমার সম্পর্কে জানতে চাইল। এটা ভদ্রসুলভ আচরনের মধ্যে পরে। আমিও ওর এখানকার সৃতি জানতে চাইলাম। দীর্ঘদিন বিদেশে আছি। নানা জাতি ধর্মের মানুষের সাথে পরিচয় হয় কথা হয়। ওদের মন মানসিকতা ও কালচার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। রেবেকার ছোটবেলার ইতিহাস বেশ স্পর্শকাতর। মনকে ভাবিয়ে তুলে। দুবছর বয়সে বাবা আর মায়ের মাঝে ডিভোর্স হয়ে যায়। মা এঙ্গোলার অধিবাসি ছিল। মা ওকে নিয়ে ওর নানির বাড়ি এঙ্গলাতে চলে আসে। কবছর পরেই ওর মা আবার বিয়ে করে স্বামীর সাথে কেপটাউনে চলে যায়। আট বছর বয়স পর্যন্ত সে নানির কাছে ছিল। এর পরে নানি অসুস্থ হওয়াতে ওর দাদু ওকে নিয়ে যায়। ওখানেই সে বেড়ে উঠে। হাইস্কুল কলেজ দাদুর বাড়িতে থেকেই সম্পন্ন করেছে। আমাকে জানালো দাদুর কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছে। এভিএশন সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে আগ্রহ অনেক। কলেজ শেষ করে এভিএশন নার্সিং এর উপরে ডিপ্লোমা করে। এরপর চাকরি পেয়ে বাহরাইনে চলে যায়।

প্রিটরিয়া ষ্টেশন এসে পউছুলাম। ওর দাদুকে দেখে মনে হল ওয়েস্টার্ন মুভির কোন জীবন্ত ক্যারেক্টার। পরনে শর্টস আর খাকি রঙের হ্যাটে গায়ে সাফারি শার্ট। শারীরিক গঠনে মনে হল দাদু বেশ শক্ত সামর্থ্য মানুষ। রেবেকা পরিচয় করিয়ে দিল। গাড়িতে করে পনের মিনিটেই পউছে গেলাম। বিশাল খোলামেলা বাড়ি। ব্যাকইয়ার্ড দেখার মত। অনেকটা রেস্টহাউজের আদলে গড়া। বিশাল লিভিং রুমে বেশ পুরানো ধাঁচের আসবাপত্র। তবে ভিনটেজ ডিজাইন বাড়ির কাঠামোর সাথে মানিয়েছে। মনে হয় বহু জেনারেশন ধরে থেকে আসছে। একটা জিনিসে অভিভুত হলাম। বিশাল এক লাইব্রেরী। লিভিং রুমের পুরো একটা ওয়াল দখল করে রাখা। না হলেও হাজার দশেক বই হবে। একেবারে সিলিং পর্যন্ত ঠাঁসা। সব পারসনাল কালেকশন। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম বিশাল বই ভাণ্ডারের দিকে। দাদু বলল এখানের বেশির ভাগ বই উনার পড়া আছে। এটা সারা জীবনের সঞ্ছয়। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে দাদু জানালেন এই লাইবেরি ছেড়ে অন্য কোথাও থাকা ওনার পক্ষে সম্ভব নয়। মানুষটির নলেজ সম্পর্কে আন্দাজ করতে অসুবিধা হলনা। কত বৈচিত্র্যময় জ্ঞ্যান তার মস্তিষ্কে লুকিয়ে আছে কে জানে।

এর মধ্যে রেবেকা ওর রুমে গেল যা নিতে এসেছে তা গোছগাছ করতে। একটু পরে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল তার কলেজে জীবনের সৃতি গুলো দেখাতে। অস্বস্তি লাগছিল এই ভেবে মাত্র দুদিনের পরিচয়। মেলামেশা স্বাভাবিক হতে সময়ের প্রয়োজন। রেবেকার আন্তরিকতার টানে সে ভাব কেটে গেল। বেশ কিছু প্রাইজ ম্যাডেল সাজানো দেখলাম। বেডের পাশে মানুষের হাতের আঙ্গুলের কটা টুকরো দেখলাম। দেয়ালে ঠেকিয়ে রাখা হিউম্যান স্কেলিটন। ওভাবেই হয়ত রেখে গিয়েছিল। ভাবলাম নার্সিং কোর্সের কারনে এসব রেখেছে।

রেবেকা কথা বলেই চলেছে। বহু বছর আগে দাদি মারা গেছেন। এখানে এখন ওর দাদুর সাথে গভর্নেস আর এক হেল্পার থাকে। একটা ব্যাগে সে জিনিষপত্র গুছিয়ে নিল। ওর রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। এর মধ্যে গভর্নেস বেশকিছু খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। এখানেও দেখলাম প্লাস্টিক মোড়ানো ড্রাই বিফ। স্ন্যাক্স হিসাবে খারাপ না। দাদু জিজ্ঞেস করল কোন ধরনের ড্রিংকস নেব কিনা। সাউথ আফ্রিকান আতিথেয়তা। বললাম গ্রিন টি হলে ভাল হয়। চা তে চুমুক দিয়েছি এমন সময় বাইরে গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। দাদু জানালো কিছু বন্ধুবান্ধব আসার কথা। উনি উঠে গেলেন তাদেরকে আনার জন্য।

# সংগ্রহীত ছবি ।।#

চারজন আফ্রিকান ভদ্রলোক আসলো। এখানে না বসে সয়াসরি ব্যাকইয়ার্ডে চলে গেল। কাঁচের স্লাইডিঙ্গ ডোরটা খোলা। দাদু ওদের সাথে কি নিয়ে যেন শলাপরামর্শ করছে। অতিথিদের ওয়াইন সারভ করল দেখলাম। ওরা কোন ভাষায় কথা বলছে বুঝতে পারলামনা। রেবেকা ওয়াশরুম থেকে এসে বলল চল দাদুকে বলে বেরিয়ে যাই। যা নেবার তা সে নিয়ে নিয়েছে। যখন ব্যাক ইয়ার্ডে গেলাম দাদু বলল এসো পরিচয় করিয়ে দি। পরিচয় পর্বে গেস্টরা সবাই আমার দিকে কেমন যেন এক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। সে দৃষ্টিতে হিপনোটিজমের আভাস পাওয়া যায়। ওদের চোখগুলো জানি কেমন। ওয়াইনের এফেক্ট কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলামনা। দাদু তখন বলল তোমাকে একটা জিনিস দেখাই। আফ্রিকান লোকগুলোর সামনে টেবিলের উপরে কিছু কাঠের তৈরি অদ্ভুত আকৃতির মানুষের বডিপার্টস। সম্ভবত এগুলো ওরা নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে একটা কঙ্কালের মুখের মত আবার তারমধ্যে ত্রিশূল আর তারার কম্বিনেসনে অদ্ভুত এক মানুষের কাঠামো। জিনিষটি ছোট কিন্তু কেমন জানি একধরনের টান অনুভব হয়। উনি জানালেন ওটা নাকি অনেক বছরের পুরানো। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ছোট্ট একটা ম্যাজিক দেখাই। পাশেই ত্রিশূল আকৃতির এক চেয়ার ছিল। চেয়ারের দু দিকে দুটি তারার নকশা। আমাকে চেয়ারে বসতে বললেন। বসার সাথে সাথে মনে হল কে যেন পেছন থেকে জাপটে ধরেছে। ত্রিশূল আর কঙ্কাল আকৃতির সেই কাঠের মাথাটি মুখের সামনে এনে বললেন এটার দিকে তাকাও। কি হচ্ছে এগুল বুঝতে পারছিলামনা। কেনই বা এদের কথা মেনে নিচ্ছি সেটা বুঝবার ক্ষমতা হারিয়েছি। সবকিছু কেমন যেন স্লোমোশানে ঘটছে। যা বলছে তা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলাম। আবারো শুনতে পেলাম কে যেন বলছে এটার দিকে তাকাও। মাত্র একটু আগে সবকিছু ঠিক ছিল। এখন কে যেন আমাকে বাধ্য করছে তাদের কথা শোনার জন্য। তাকালাম ওই জিনিসটার দিকে। কি আর হবে। সামান্য একটা খেলনা ছাড়া আর কি। দৃষ্টি আটকে থাকলো ওটার দিকে। মনে হল ঐ জিনিসটা বুঝি জিবন্ত হয়ে উঠলো। শরীরের ভেতরে কেমন যেন এক অবসাদ নেমে এলো। চেষ্টা করেও দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে পারছিনা। আশপাশের সব কিছুই থমকে আছে। কোন শব্দ নেই যেন এক হলো চ্যাম্বারে বসে আছি। ভাবছি এক কিন্তু ঘটছে অন্যকিছু যা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই।

চারজন মানুষ চারদিকে দাঁড়ানো। কোত্থেকে যেন রেবেকা এসে সামনে দাঁড়ালো। সবকিছু দেখতে পাচ্ছি শুনতে পাচ্ছি কিন্তু একবিন্দু নড়াচড়া করতে পারছিনা। রেবেকা কালো হুডি পরা আর ঠোটে টকটকে লাল লিপিস্তিক দেয়া। আমার দিকে ঝুকে আসছে। আমি চেষ্টা করলাম চেয়ার ছেড়ে উঠে যেতে কিন্তু তা পারছিনা। শরীরটা চেয়ারের মধ্যে ফিক্সড হয়ে গেছে। কিছু বলতেও পারছিনা। রেবেকা আমার টি শার্ট টেনে খুলে ফেলল। হাতে নিডেলের মত কি যেন দেখলাম। সামনে ঝুকে এসে ওটা দিয়ে আমার চেস্টের ঠিক সেন্টারে ক্রসের দাগ দিল। আশ্চর্য কোন ব্যাথা পেলামনা। এরপর দেখি নাভির দুই দিকে দুটি একিই ভাবে ক্রসের দাগ দিল। স্বপ্নের মত সবকিছু ঘটছে। শার্প নিডেলের দাগ কাটছে শরীরে অথচ কোন ফিলিং নেই। মুভ করতে চাচ্ছি কথা বলতে চাচ্ছি কিন্তু সব বৃথা। অন্যরা এসব নিয়ন্ত্রন করছে। ঐ চারজন লোক বিজাতীয় ভাষায় বিড়বিড় করছে। এরপর আর কিছু মনে নেই।

কেমন নিস্তব্দতা সবদিকে। হোটেলে ফিরে যাওয়া আর সেমিনারের সময়টা জানি কখন। আমার অবস্থানটা কোথায় তা বুঝতে পারছিনা। ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। কোথায় আছি কি করছি তখনও ঠিক ধাতস্ত হতে পারিনি। কি হল আমার। কি যেন কি ঘটে গেল। কখন ঘুমিয়ে পড়লাম। ওসব কি তাহলে স্বপ্ন ছিল। ব্যাক ইয়ার্ডের সাথে লিভিংরুমে যাবার কাঁচের স্লাইডিঙ ডোর দিয়ে ঢুকে দেখি রেবেকা আর দাদু বসে গল্প করছে। অন্য কাউকে দেখলাম না। রেবেকা বলল তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে তাই ডিস্টার্ব করিনি। চল বেরিয়ে পড়ি।

কাল সকাল বেলাতেই সেমিনার শুরু। সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্ন এমন জিবন্ত হতে পারে আগে কখনো ফীল করিনি। কিন্তু লোকগুলো যখন এলো তখনো আমি ডাইনিং টেবিলে বসে ছিলাম। তারপর বিদায় নেবার জন্য রেবেকার সাথে পেছনের আঙ্গিনায় গেলাম। দাদু বললেন কি যেন একটা মজার জিনিষ দেখাবেন। তারপর অদ্ভুত সে ঘটনার অবতারনা হোল। সব মনে করতে পারছি। কিন্তু দাদু রেবেকা কেউ কিছু বলছেনা। সবকিছু যেন নর্মাল কিছুই ঘটেনি। মাথায় এলোমেলো চিন্তা এসে জড় হোল। সত্যি মিথ্যা সব যেন একাকার।

দাদু ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে বিদায় নেবার সময় বললেন সুযোগ পেলে আবারো যেন এসে দেখা করি। উপলদ্ধি করলাম মানুষের ভয় জিনিসটির ভাল দিক হচ্ছে এটা ডিফেন্সিভ মেকানিজম হিসাবে কাজ করে। এতে করে আগেভাগে সাবধান হতে পারা যায়। মেনে নিতে পারছিনা ওটা কোন ড্রিম ছিল। এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটার আগে বিন্দুমাত্র ধারনা ছিলনা কি হতে যাচ্ছে। ভেবেছিলাম মজার কোনকিছু হবে। তাছাড়া দাদুর মতো বিদ্বান মানুষ এধরনের বিষয় নিয়ে চর্চা করবে তা ভাবতে পারিনি। রেবেকা কথাচ্ছলে বলেছিল সে দাদুর কাছথেকে অনেক কিছুই শিখেছে। তাহলে কি ও এসবের ইঙ্গিত দিয়েছিল।

ট্রেনে যখন ফিরছিলাম রেবেকাকে বললাম সত্যি অদ্ভুত লাগছে কি করে আমি হটাৎ ঘুমিয়ে গেলাম। সে কিছুই বললনা। ওর ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি দেখে যুক্তির সাথে আবারো কনফিউশনের ঠোকাঠুকি লেগে গেল। ঘটনাগুলো কি আদৌ ঘটেছে নাকি স্বপ্ন দেখে অযথাই এসব ভাবছি। সরাসরি এ নিয়ে কথা বলতে কেমন যেন সঙ্কোচ হচ্ছিল। মাত্র দুদিনের পরিচয়ে এতকিছু ঘটে গেল তা ভাবতে অবাক লাগছে। উত্তর না পেয়ে আবারো বললাম সত্যি ভেবে পাচ্ছিনা ওখানে কি করে ঘুমিয়ে পড়লাম। আচ্ছা ঐ মানুষ গুলো কখন বিদায় নিল। রেবেকা নিরবতা ভাঙল। বলল দাদুর গেস্টদের কথা বলছ। ওরা তো অনেক আগে চলে গিয়েছিলেন। নিজের সাথে নিজে মগজ খাটিয়ে বুঝবার চেষ্টা করছি। এতকিছু আশেপাশে ঘটে গেল অথচ দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম এমন অজানা অচেনা এক পরিবেশে। কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছিনা।

ম্যাজিক সম্পর্কে কিছু ধারনা আছে। ব্ল্যাক ম্যাজিক আর হোয়াইট ম্যাজিক। যা ক্ষতিকর তাই ব্ল্যাক আর যেটা মানুষের খারাপ দিকগুলো অপসারন করে তাই হোয়াইট। চুল কিংবা ব্যবহারের কাপড় দিয়ে অথবা চোখের ব্যবহার দিয়ে মানুষকে বস করা সম্ভব। রেবেকা ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছে। লক্ষ্য করলাম লিপস্টিক মুছে ফেলার পরে আবছা লাল দাগের চিহ্ন এখনো ওর ঠোটের মধ্যে। সরাসরি কিছুই বলতে পারছিনা। তার চেহারাতে অস্বাভাবিক কোন অভিব্যাক্তি নেই। সবকিছুই যেন নরমাল। কিছুই ঘটেনি। হোটেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলামনা। দেখতে চাই আমার শরীরে কোন দাগ আছে কিনা।

হোটেল লবিতে আসার পরে রেবেকা বলল দাদু গিফট দিয়েছে। হাতে এক প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলল রুমে গিয়ে খুলতে। ওকে বিদায় জানিয়ে রুমে গিয়ে গিফটটি বিছানায় রেখে টিসার্ট খুলে দেখি সত্যিই চেস্টের সেন্টারে ক্রস আর নাভির দুই দিকে দুটি ক্রস দেয়া। অনেটা ট্যাটুর মত। তোয়ালে পানিতে ভিজিয়ে সাবান দিয়ে অনেক চেষ্টা করলাম দাগ মুছে ফেলতে কিন্তু কিছুই হলনা। মনে হল এটা শরীরের সাথে পার্মানেন্ট হয়ে গেছে। রুমে রাখা গিফট খুলে দেখি পুরানো কাঠের সেই অদ্ভুত জিনিসটি তার সাথে ছোট কাগজে ইংরেজিতে লেখা আমরা সবাই কানেক্টেড সবসময় গিফটটা সাথে রেখ।

ইতিহাস বলে খৃষ্টপূর্ব দুহাজার সাতশো বছর আগেই মিশরের মানুষ এ সম্পর্কে জেনেছে। গ্রীক আর পেগানরা খৃস্টপূর্ব তেরশ শতকে এসবের মধ্যে ঢুকে পড়ে। পৃথিবীর এমন কোন জাতীগোষ্ঠী খুজে পাওয়া মুস্কিল যাদের এ সম্পর্কে ধারনা নেই। বহু গ্রন্থে এই বিষয় নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়েছে। বিছানার উপরে পড়ে থাকা কঙ্কালের মাথা ত্রিশূল আর তারা সদৃশ অদ্ভুত গিফট টির দিকে তাকাতে ইচ্ছে হলনা।

জানি মানুষের যুক্তিবাদী মন এসব মেনে নেবেনা তাই ঘটনাটি বিশ্বাস করা না করার ভার পাঠকের উপরে ছেড়ে দিলাম।

# সুপ্রিয় পাঠক, নিরাপত্তার কারনে আমার লেখায় অনেক কিছুই লিখতে পারি না। বিধি নিষেধ! বিভ্রান্ত না হয়ে আর সেটুকু মেনে নিয়ে সাথে থাকবেন—এই আশা মনে রাখছি।

রেহমান রুদ্র । ফেব্রুয়ারি ২০২১।
# # রেহমান রুদ্র # #

# রেহমান রুদ্রের লেখাগুলি হ্যালো জনতার কাছে সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত । হ্যালো জনতার সাহিত্য তে সব পাওয়া যাবে ।পড়ুন ।

# নতুন আকর্ষণ চলছে -শুক্রবারের রান্নাঘর । পাবেন প্রতি বৃহস্পতিবারে #

# একটি হ্যালোজনতা প্রেজেন্টেশন #

।। হ্যালো জনতা.কম ।।

নুপুর ।।

19 COMMENTS

  1. গল্পের প্রতিটা লাইন পড়ছি আর প্রতিটা শব্দ গুলোই ভিন্ন লাগছে। পুরো গল্পের মধ্যে কেমন জানি অদ্ভুত বিষয় খুজে পাচ্ছিলাম।

    • লেখকের এবং আমাদের ধন্যবাদ — Many Thanks To you.
      হ্যালো জনতা ডট কম ।

    • লেখকের এবং আমাদের ধন্যবাদ — Many Thanks To you.
      হ্যালো জনতা ডট কম ।

  2. স্বপ্ন তো স্বপ্ন ই। কিন্তু আমার কাছে রেবেকার বিষয় গুলো আধ্যাত্মিক মনে হলো।

    • লেখকের এবং আমাদের ধন্যবাদ — Many Thanks To you.
      হ্যালো জনতা ডট কম ।

  3. স্যার রুদ্র নতুন কিছু পড়তেই শুভেচ্ছা,আমাকে কয়েক বার পড়তে হয়েছে।তারপরেও মনে হচ্ছে,আসলে কি হয়েছিল? হোটেল ফিরে চিহ্ন গুলো দেখতে পাওয়া🤔🤔হুমম।ভাবছি শুধু ভাবছি,অদ্ভুত লাগছে।
    কিছু ক্ষণের জন্য হারিয়ে গেলাম রেবেকার দাদুর বাড়ীতে।

  4. Captain Rahman’s gifted ability to blend boulders with sands and then make a seamless bed of dreadful thoughts into some weird romance in a terra incognito had produced a marvel of travel through some mystery beyond comprehension! Not sure if the Captain narrated experience or he experimented the black and white magic on his readers! If the last imagination is not true – then indeed it is many steps beyond the science or experience to fathom; but the write up fathomed well it and took is into very deep

    • লেখকের এবং আমাদের ধন্যবাদ — Many Thanks To you.
      হ্যালো জনতা ডট কম

  5. রেবেকা … রিনিঝিনি রোম্যান্টিক একটি নাম অথবা একজন কিভাবে ঘটনার গভিরে ভৌতিক পরিবেশে গা ছমছম করা সময় ভ্রমনে ( time travel) নিয়ে গেলো তার সব টুকুই ভীতিকর ।। এপারতেড মিউজিয়াম আমিও ঘুরেছি …… আজ আবার ও জহানেসবারগ স্মৃতি জাগানিয়া এই লেখা পড়ে তৃতীয় বার অতি প্রাকৃতিক এক ভ্রমণ শেষ করলাম … এই কৃতিত্ব লেখকের …শুভকামনা অশেষ ।

  6. গল্পটা পড়ে আমি নিজেই বুঝতে পারছিনা কি ঘটেছিলো ? বড় অদ্ভুত লেখক বুঝতে পারছিলেন না তিনি স্বপ্ন দেখছেন কিনা বা কি ঘটেছে ? শরীরের চিনহ গুলো আসলে কি করে এলো ,গোলক ধাঁধায় পড়ে গেলাম,কালো মেজিক, সাধা মেজিক এর ব্যাপারে কিছু পডেছি এবং শুনেছি আজ আবার শুনলাম.

    • আসলেই, তবে এগুলোর চর্চা ছিল আর আছে। চলছে অনাদিকাল থেকে।ধন্যবাদ।
      হ্যালো জনতা ডট কম।

  7. উপলব্ধি *****লেখক সশরীরে উপস্থিত থেকে নিজ চোখে দেখে যা জানেন বুঝেন তাই প্রকাশ করেন নিজের ভাষায়। উনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বেশ সমৃদ্ধ। বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন লেখক। দেখেছেন বিভিন্ন ধরনের জনপদ ও তার মানুষ। চলতে গিয়ে পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন খুব সহজেই। স্বহৃদয় ও সরস মানসিকতা থাকার জন্য আসেপাসের মানুষের সাথে কম সময়ে মিশে যান তাদের অন্তরের অনেক গভিরে। লেখকের আগাম চিন্তা শক্তি প্রখর। তাই আমার মনে হয়, লেখক রেবেকার মধ্যে এমন কিছু দেখতে পেয়েছিলেন অথবা অনুভব করেছিলেন তা যাচাই করার জন্য রেবেকার দাদুর বারিতে বেরাতে গিয়েছিলেন প্রোগ্রাম ছাড়াই। ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here