“প্রতিরোধ যুদ্ধে চট্টগ্রাম – ১৬ “লিখছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ মাহফুজুর রহমান।।

0
66

বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম ১৬ ভারতের ক্যাম্পে চট্টগ্রামের যোদ্ধা।

ভারতের ক্যাম্পে চট্টগ্রামের যোদ্ধা
অভ্যর্থনা:
চট্টগ্রাম হতে ভারত পৌঁছার পর প্রশিক্ষণ ইচ্ছুক বা যোদ্ধাদের অভ্যর্থনা জানাতেন প্রধানতঃ দলীয়
কর্মীরা। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ দলীয় কর্মীদের সংবর্ধনা জানাতে উপস্থিত থাকতেন চট্টগ্রাম
আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের নেতারা। এ ব্যাপারে মোশাররফ হোসেন, এস এম ইউসুফ, স্বপন চৌধুরী, সাবের
আহমদ আসগরী, আলতাফ হোসেন, রাখাল বণিক, বেলায়েত হোসেন চৌধুরী মুখ্য ভূমিকা রাখতেন। কোয়াংবাড়ি
নবীনগর বাজারে প্রায়ই নেতারা আসতেন যোদ্ধা, ছাত্র যুবকদের নিয়ে যেতে।
কমিউনিস্ট পার্টি ও তার সহয়োগীদের অভ্যর্থনা জানাতে তাদের দলীয় নেতারা থাকতেন। তাদের অভ্যর্থনা
ক্যাম্পও আলাদা ছিল। প্রধানতঃ খোরশেদুল ইসলাম, আহসানউল্লাহ চৌধুরী প্রমূখ তাদের দলীয় ছেলেদের
গ্রহণ করতেন।
চীনপন্থী সংগঠনের প্রাথমিকদিকে কোন অভ্যর্থনা শিবির ছিলনা। পরবর্তীতে তাদেরও অভ্যর্থনা শিবির খোলা
হয়। ওবায়দুল হক বলি ও প্রফেসর নুরুল আবছার অভ্যর্থনার দায়িত্বে ছিলেন। যারা রাজনীতি করতেন না তারা
ভারত যাওয়ার আগেই সাধারণতঃ রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে সম্পর্কিত হয়ে যেতেন।
যাদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় ছিলনা প্রাথমিকদিকে তাদের যথেষ্ট অসুবিধা পোহাতে হয়েছে। শিবির হতে শিবিরে
ঘুরতে হয়েছে। পরবর্তীতে অবশ্য রাজনৈতিক পরিচয়হীন যুবকদের সংখ্যা বেড়ে গেলে তাদের ট্রেনিংএর ব্যবস্থা
হয়। সন্দেহের অবকাশ নেই এ সব অদলীয় যোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধে কারো চাইতে কম অবদান রাখেননি।
যুব শিবির বা ইয়ুথ ক্যাম্প:
ছাত্র যুবকরা এসব শিবিরে থাকতেন। শিবিরের একটি প্রশাসন ব্যবস্থা ছিল। এর অধীনে যুবকদের রাজনৈতিক
প্রশিক্ষণ, আধা সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হত। এসব প্রশিক্ষণের মাঝে ছিলঃ

যুদ্ধের কারণ ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যায় ক্লাস নেয়া:
ছাত্র ও যুবকদের এক অংশ সচেতনভাবেই প্রশিক্ষণের জন্যে যুব শিবিরে যেতেন। কিন্তু এক বিরাট অংশ পাক
বাহিনীর অত্যাচারের কারণে প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে যুব শিবিরে যান, ট্রেনিং শেষে পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর
প্রতিশোধ নেবে এ উদ্দেশ্যে। অনেকে বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয় নেই ভেবেও এসব শিবিরে আসেন।
মুক্তিযুদ্ধ কোন প্রতিশোধ স্পৃহার ব্যাপার নয়। পাকিস্তানী বাহিনী অত্যাচার না করলেও তাদের বিরুদ্ধে ঘোষিত
যুদ্ধ চালাতে হবে। নিরাপদ আশ্রয় পেলেও যুদ্ধ বন্ধ না করে সে আশ্রয় বাবহার করে পাকিস্তানী বাহিনী ও
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। শিবিরে অবস্থানরত যুবকদের এসব কথাগুলো বোঝান হত। এগুলোর
পক্ষে যুক্তি দাঁড় করান হত। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন লেকচারের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ছাত্র যুবকদের বাংলাদেশের
অতীত ইতিহাস, পাকিস্তানের শোষণ ও অগণতান্ত্রিক বৈষম্যপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক
কার্যকলাপ তুলে ধরা হত। এভাবে দলমত নির্বিশেষে ছাত্র যুবকদের রাজনৈতিকভাবে জ্ঞান সমৃদ্ধ করা হত।
বিভিন্ন যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কিত বক্তৃতা দিয়ে যুদ্ধের পদ্ধতি কি হবে, এলাকায় বন্ধু ও শত্রু কিভাবে বাছাই
করতে হবে, বেইজ এলাকা গড়ে তোলার পদ্ধতি, ভবিষৎ যুদ্ধ পদ্ধতি- এ সব সম্পর্কে ধারণা দেয়া হত।
বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি পদ্ধতি কি আছে, কি করতে হবে, গ্রামীণ কুটির শিল্পের বিকাশ কিভাবে ঘটাতে হবে,
পঞ্চায়েত কাঠামো কি হবে এসবের ব্যাখ্যা দেয়া হত।
এককথায় বলা চলে বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যুব শিবিরগুলোকে একটি ধারণা দেয়ার
চেষ্টা করা হত এবং স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির জাতি হিসেবে টিকবেনা, শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থায় যেতে
পারবেনা এ ধারণা দিয়ে-যুদ্ধই সমস্যার একমাত্র সমাধান তা বোঝান হত।

শিবিরের প্র্যাকটিক্যাল কাজঃ
প্রতিদিন লাইনে দাঁড়ান ও শারিরীক কসরৎ করান হত। ক্যাম্পের পরিচ্ছন্নতার কাজসহ সব কাজই করতে হত
সেখানে অবস্থানরত ছাত্র যুবকদের।
রিভলবার, স্টেনগান, গ্রেনেডের ব্যবহার, বিনা অস্ত্রে আত্মরক্ষা পদ্ধতি এসব শিখান হত।
উল্লেখ্য, ভারতের সব শিবিরই বাংলাদেশের যোদ্ধারা নিজেরাই তৈরি করেছেন। মালামাল দিয়ে সাহায্য করেছে
ভারত।
কয়েকটি ক্যাম্প পরিচিতি:
হরিনা ক্যাম্প:
চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রামের যোদ্ধাদের এটিই ছিল সবচাইতে বড় ক্যাম্প। প্রাথমিকদিকে সবাই এ ক্যাম্পে
ছিলেন। পরবর্তীতে যোদ্ধারা এখান হতে বিভিন্ন ক্যাম্পে যান।
প্রাথমিকদিকে এ সব ক্যাম্পেই স্বল্প সময়ের ট্রেনিং নিয়ে অসংখ্য যোদ্ধা দেশের অভ্যন্তরে ঢুকেছেন। এ সব
ক্যাম্পের মাঝে বগাফা ছিল যোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান ট্রেনিং সেন্টার। হরিনা হতে ট্রেনিংএর জন্য বগাফা
পাঠান হত। পরে বগাফা হতে আবার হরিনাতে এসে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যোদ্ধারা বাংলাদেশে ঢুকতেন।
হরিনাতে শুরু হতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেনঃ
প্রধান- এম এ হান্নান। উপ প্রধান- মোশাররফ হোসেন এম পি।
পরিদর্শক-জিতেন্দ্র প্রসাদ মন্টু। রাজনৈতিক ইনষ্ট্রাকটার এডঃ আজিজুল হক চৌধুরী, প্রফেসর নূর
মোহাম্মদ, নুরুল আবসার, আবদুল্লাহ হিল মামুন। ছাত্র প্রতিনিধি আবু মোহাম্মদ হাশেম। মেডিক্যাল অফিসার
ডাঃ এখলাছউদ্দিন, মেডিক্যাল এসিসট্যান্ট হামিদউল্লাহ।
অফিসের দায়িত্বে – কাজী সিরাজ, মহিউদ্দিন রাশেদ। আহার ব্যবস্থাপনায় – আবু তাহের, জিতেন্দ্র প্রসাদ নাথ
মন্টু। এছাড়াও পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন কাসেম মোক্তার, এডঃ রফিকুল আলম, জালালউদ্দিন
আহমদ, শামসুদ্দিন, আনোয়ারুল আজিম, নুরুল হক, সুলতান আহমদ, আব্দুস সালাম, জয়নাল আবেদীন, এ বি এম
নিজামুল হক, কামাল, অরুন, মণি, কচি, বোরহান, ফজলু, অমল, বশর, রফিক, মুকুল, বাদশা আলম, জহুর, সাহেব
মিয়া, নবী ড্রাইভার প্রমূখ। প্রাথমিকদিকে মেজর জিয়াউর রহমান এখান থেকে ট্রেনিংপ্রাক্ত যোদ্ধাদের
দেশের ভিতর পাঠাতেন। পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন রফিক এ দায়িত্ব নেন।
সেপ্টেম্বরে ডাঃ বি এম ফয়েজ ইনডাকশনএর দায়িত্বে ছিলেন। ডাঃ মান্নান, মোশাররফ, মীর্জা মনছুর অনেকেই
ট্রেনিং-এ চলে যাওয়ায় তিনি এ দায়িত্ব পান। মূলত এ দায়িত্ব ছিল তাদের। এখানে আরো ছিলেন ডাঃ মেজর
শামসুল হক, ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাঃ এনাম, শামসুল ইসলাম, নাজমুল হুদা প্রমূখ।
এ ক্যাম্পে ক্যাঃ কাদেরের সম্মানে একটি ব্যারাকের নাম ক্যাঃ কাদের ব্যারাক রাখা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম বি এল এফ সদস্যদের প্রধানতঃ এ ক্যাম্প হতেই নিয়ে যাওয়া হত গোপনে। এ ব্যাপারে আবু মোহাম্মদ
হাশেম, এ বি এম নিজামুল হক, জালালউদ্দিন আহমদ প্রমূখ ছাত্র নেতা সাহায্য করতেন।
হরিনা ক্যাম্পের আরেক নাম ছিল এম এ আজিজ ইয়ুথ ক্যাম্প।
উদয়পুর ইয়ুথ ক্যাম্প, ধজনগর ইয়ুথ ক্যাম্প:
এ ক্যাম্পে চট্টগ্রামের যোদ্ধাদের সাথে নোয়াখালী, কুমিল্লা এসব জেলার যোদ্ধারাও থাকতেন। প্রাথমিকদিকে
এ ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন ক্যাপ্টেন মুনছুর আলী ও উপ প্রধান ছিলেন আবদুল্লাহ আল হারুন, পরে জনাব হারুন
ক্যাম্প প্রধান নিযুক্ত হন। এখানে আরো ছিলেন কফিল উদ্দিন, মীর্জা মনছুর, অধ্যাপক মিহির কান্তি দত্ত,
অধ্যাপক রসুল, আবদুল বারী খান, ডাঃ এস এল দে।
এ ক্যাম্পের হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন কৃষ্ণবাবু। ভা! কালিপদ পালিত ছিলেন এ ক্যাম্পের চিকিৎসক।
বগাফা ট্রেনিং ক্যাম্প:
সম্ভবতঃ এটি ছিল যোদ্ধাদের প্রথম ক্যাম্প, যার শুরু প্রতিরোধ যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই। এখান হতে ট্রেনিং
নিয়ে হাজার হাজার যোদ্ধা বাংলাদেশে এসে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয়। এটি হরিনা ক্যাম্পের সাথে সম্পৃক্ত
ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল।

ওমপিনগর ট্রেনিং ক্যাম্প:
এ ট্রেনিং ক্যাম্পটি যোদ্ধারা নিজেরাই জঙ্গল কেটে সাফ করে তৈরি করেন।
এখানে ছিলেন নুরুল আফসার, শাহ আলম, মিহির চৌধুরী, মাহফুজুল বারী, রণবিক্রম তাতু, আবুল কালাম আজাদ,
আবুল কাসেম চিস্তি, আহসানউল্লাহ, নাজিমউদ্দিন চৌঃ, ইউছুপ খান, কে এম কামালউদ্দিন, এ টি এম নুরুল
আমিন, ইলিয়াস, আবদুল করিম চৌধুরীসহ আরো শত শত যোদ্ধা।
প্রথমদিকে এখানে ট্রেনিং দিতেন চাঁদপুরের কর্ণেল মজুমদার।
লেম্বাছড়া ট্রেনিং ক্যাম্প:
এখানে ছিলেন হিমাংশু বিমল, আবদুল্লাহ আল রায়হান, নুরুল আলম, সিরাজউদ্দিন ওরফে মোঃ সিরাজ প্রমূখ।
পোমাংবাড়ী সার্জেন্ট জহুরুল হক ইয়ুথ ক্যাম্প:
এ ক্যাম্পে মিরশ্বরাই কর্মীদের সংখ্যাধিক্য ছিল। খাজা খায়ের এ ক্যাম্পের প্রধান ও মীর্জা ফিরোজ ছিলেন
উপ প্রধান। এ ক্যাম্পে যোগাযোগ রাখতেন মিরশ্বরাই এর দিলীপ, আলতাফ হোসেন, রাখাল চন্দ্র বণিক,
বেলায়েত হোসেন প্রমূখ।
দেমাগ্রী ইয়ুথ ও ট্রেনিং ক্যাম্প:
এ ক্যাম্পে ছিলেন আবু সালেহ, ভূপেন বাবু, সরওয়ার কামাল, মোখতার আহমদ, গোলাম রব্বানী প্রমূখ। এ
ক্যাম্পে ২০-২২ হাজার শরণার্থী আশ্রয় নেয়। এখানে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাঙালি সেনারা ট্রেনিং দিত। এখান
হতে বি এল এফ সদস্য রিক্রুট হয়েছেন প্রচুর। এখানে হতে ট্রেনিং নেন চট্টগ্রামের অসংখ্য যোদ্ধা। বি এল
এফ এর একটি স্বল্পকালীন ট্রেনিং সেন্টার খোলা হয়েছিল ক্যাম্প। এখানে ট্রেনিং নেন রাঙ্গুনিয়ার নুরুন্নবী,
নুরুল হক, কুতুবউদ্দিন, পটিয়ার তোজাম্মেল, চন্দ্রনাইশের মান্নান, নূর হোসেন, এম এন ইসলাম, নাসির,
বাদশাসহ হাজার হাজার যোদ্ধা দেশে ঢুকেছেন যুদ্ধ করতে।
বগা পাহাড় ক্যাম্প:
এখানে ট্রেনিং নেন ডাঃ সালেহ আহমদসহ চট্টগ্রামের অসংখ্য যুবক।
তেইল্যামোড়া ক্যাম্প:
এখানে ছিলেন কাসেম চিস্তি, ডাঃ শাহ আলম প্রমূখ। এখান হতে ডাঃ শাহ আলমসহ অনেকে চলে যান নেভাল
ট্রেনিং এ।
শ্রীনগর ক্যাম্প:
প্রতিরোধ যুদ্ধের পরপরই চীনপন্থী নেতাদের তত্ত্বাবধানে এখানে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প চালু হয়। মূলতঃ
মিরশ্বরাই এলাকার ছাত্র যুবকরা এখানে জমায়েত হত। ক্যাম্প পরিচালনার জন্যে ভাসানীপন্থী নেতা ওবায়দুল
হক বলী, ব্যারিষ্টার নুরুল আফসার, ছাত্রলীগ নেতা জাফর আহমদকে নিয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি
হলেও তাতে ভাসানীপন্থীদের যথেষ্ট প্রাধান্য বজায় থাকে। এ ক্যাম্পে যোগাযোগ রাখতেন কাজী জাফর, দেবেন
সিকদার প্রমূখ। ক্যাম্পের ট্রেনিং এর দায়িত্বে ছিলেন ক্যাঃ ঘোষ। এর মাঝে মিরশ্বরাই আওয়ামী লীগের
এককালীন সম্পাদক আলতাফ হোসেন শ্রীনগর পৌছলে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। জনাব আলতাফ ” দ্যা পাকিস্তান
অবজারভারে” চাকরী করতেন। সেখান হতে তিনি শ্রীনগর আসেন। জনাব বলী ও ব্যারিস্টার আফসার এ সুবাদে
আলতাফ হোসেনকে পাকিস্তানী বাহিনীর দালাল বলে চিহ্নিত করতে চাইলেন। এক পর্যায়ে আলতাফকে মারার
চেষ্টাও চলে। এর মাঝে আলতাফ হোসেন যোদ্ধাদের পারাপার করতে মোহামদউল্লাহ ও লম্বা মোশাররফ নামে দু
ব্যক্তিকে নিয়োজিত করেন। ওবায়দুল হক বলী এ দুজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেলে দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ ধারণ
করে। জনাব আলতাফ কৌশলে হরিনা ক্যাম্পে গিয়ে সব জানালে মোশাররফ হোসেন এমপি, এস এম ইউসুফ, স্বপন
চৌধুরী, সাবের আহমদ আসগরী, জিতেন্দ্র প্রসাদ নাথ মন্টু প্রমূখ শ্রীনগর ক্যাম্পে এসে বন্দীদের মুক্ত করে
নেন। ওবায়দুল হক বলী প্রমূখ মেজর শওকত ও ক্যাঃ ঘোষের সাহায্যে এদের আক্রমণ হতে বেঁচে যান।
পরবর্তীতে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও সাধারণ যোদ্ধারা এ ক্যাম্প হতে চলে গেলে ক্যাম্প দূর্বল হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে এ ক্যাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
এ ক্যাম্প হতে প্রথম ট্রেনিং নিয়েছিলেন শহর কমান্ডার ডাঃ জাহাঙ্গীর কবির। তিনি জানান-এ ক্যাম্প হতে
ট্রেনিং নিয়ে আমি ছাগলনাইয়া যাই। সেখানে আমাদের জোতদার-মহাজন মারার কথা বলায় আমি তাদের দল ছেড়ে
বি এল এফ এ চলে যাই। এ ক্যাম্প হতে প্রশিক্ষণ নিয়ে দলবলসহ মিরশ্বরাই এ ঢোকেন এফ এফ কমান্ডার
হিসেবে কাসেম রাজা। যুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দিলেও শুধুমাত্র এ জাতীয় নীতির কারণেই তাকে এলাকায়
নিগৃহীত হতে হয় ও শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হয়।
শ্রীনগর বাজার অনুপ্রবেশ ক্যাম্প:
শ্রীনগর বাজারে যোদ্ধাদের একটি ইনডাকশন ক্যাম্প ছিল। আলতাফ হোসেন, স্বপন চৌধুরী, সাবের আহমদ
আসগরী, এস এম ইউসুফসহ অন্যান্য বি এল এফ নেতারা এখানে প্রায়ই আসতেন যোদ্ধাদের নিয়ে যেতে ও
ঢোকাতে। এক সময়ে এর প্রধান ছিলেন আবুল খায়ের।
চাকুরিয়া ট্রেনিং ক্যাম্প:
এখানে সংসদ সদস্যদের ট্রেনিং দেয়া হত শেষ দিকে। এখানে ট্রেনিং নেন চট্টগ্রামের ডাঃ এম এ মান্নান,
মোশাররফ হোসেন, মীর্জা আবু মনছুর প্রমূখ এমপি।
বাতিসা ক্যাম্প:
কুমিল্লা সীমান্তে অবস্থিত এ ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ ছিল চীনপন্থীদের হাতে। গেদু কাজী নিয়ন্ত্রিত এ ক্যাম্পে
কাজী জাফর অনুসারীরা থাকতেন ও ট্রেনিং নিতেন। এখানে ট্রেনিং নিয়ে চেউরাতে বিভিন্ন অপারেশনের অংশ নেন
চট্টগ্রামের ইবরাহিম হোসেন বাবুল, আনিসুর রহমান রাজা, প্রকৃতি ভুষণ বড়ুয়া প্রমূখ। এ তিনজন বিপ্লবী ছাত্র
ইউনিয়নের নেতা ও কর্মী যখন ভারতে ঢোকেন তখন তাদের বিপদ সম্পর্কে বাবুল বলেন– আমরা ১৭ জন
ছাত্রসহ সাবরুমে গেলে সেখানে ছাত্রলীগের অধ্যাপক হুমায়ুনের সাথে দেখা হয়। সেখান ফালান সাহা অস্ত্রসহ
আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন। তার কথা মত পুলিশ কার্ড নিতে গেলে আমাদের গ্রেফতার করা হয়। এর মাঝে
আমার মামা ডাঃ আহমুদুল হক এসে আমাদের ৩ জনকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। আমরা আগরতলা সি পি আই এম
অফিসের দিকে যাত্রা করি। আগরতলা গিয়ে দেখা পাই আব্দুল্লাহ আল নোমান, ফালান সাহা, দিলীপ সুরের। পরে
আমরা যাই উদয়পুরে সি পি আই এম অফিসে। রাতে ছিলাম ত্রিপুরা শিক্ষক সমিতির অফিসে। ওখানে দেবেন
শিকদার, আবুল বশার, অমল সেন, নাসিম আলী প্রমুখের সাথে দেখা হয়। একদিন পর আমরা বাতিসা ক্যাম্পে চলে
যাই।— জনাব বাবুলের বক্তব্য ভারতে চীনপন্থীদের সাধারণ অবস্থার বিবরণ বলে ধরে নেয়া যায়।
জনাব বাবুল আরো বলেন, “এর মাঝে আমরা ক্র্যাফটস হোস্টেলে গিয়েছিলাম। সেখানে আবু তাহের মাসুদ,
বখতেয়ার নূর সিদ্দিকীর সাথে দেখা হলে আমাদের অসুবিধার কথা বলে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করার অনুরোধ
জানাই। তারা আমাদের একমাস রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ নেয়ার পর ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করবেন জানালে আমরা
চলে আসি।— এটা ভারতে চীনপন্থী ও রুশপন্থীদের মাঝে আন্তঃসম্পর্কের একটি ধারণা দেয়।
রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি ও সহযোগীদের অবস্থান:
চট্টগ্রাম ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিষ্ট পার্টির নেতারা থাকতেন CTTI, বিরেন্দ্র বিক্রম কলেজ, বরদুয়া
খালী, কর্তাবাড়ী প্রমূখ স্থানে। সিটিটিআই ক্যাম্পে থাকতেন চট্টগ্রামের এ এম এম শহীদুল্লাহ, মনু ক্যাম্পে
থাকতেন আহমেদুর রহমান আজমী। এসব ক্যাম্পগুলোতে আরো থাকতেন মণি সিং, চৌধুরী হারুনূর রশীদ,
মোজাফফর আহমদ, মোঃ ফরহাদ, জহির রায়হান, মতিয়া চৌধুরী, জ্ঞান চক্রবর্তী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য,
আলমগীর কবির, অনিল মুখার্জী, মাহবুবুল হক, আহসানউল্লাহ, খোরশেদুল ইসলাম, আবদুল হাদী, বখতেয়ার নূর
সিদ্দিকী, আবুল কালাম আজাদ, আবু তাহের মাসুদ, শেখর দত্ত প্রমূখ কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রামের রুশপন্থী
নেতৃত্ব।
এদের ডাক্তার হিসাবে ছিলেন ডাঃ সরওয়ার আলী।
এছাড়াও নেভীর আবদুর রউফ, ডঃ আনিসুজামান প্রমূখ যোগাযোগ রাখতেন ক্রাফটস হোস্টেলে। এদের ট্রেনিং
হত আসামের তেজপুরে। তেজপুরে পাঠানোর আগে নেতারা ছাত্র যুবকদের বাছাই করতেন। এখানেও বাছাই করা
হত।
ডিমাতলী ক্যাম্প:
এখানে চট্টগ্রামের ছেলেরা থাকত। এনামুল হক দানু, আনোয়ারুল ইকবাল প্রমূখ এখান হতে বি এল এফ এ যান।
এন পি সি সি রেষ্ট হাউজ:
এটা ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের অফিস। জহুর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, সিরাজুল হক মিয়া, দানু,
ওসমান খান প্রমূখ এখানে থাকতেন। এটা চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতাদের যোগাযোগ কেন্দ্র ছিল।
শ্রীধর ভিলা:
এটা ছিল বি এল এফ নেতাদের প্রধান দফতর। শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক,
তোফায়েল আহমদ প্রমূখ প্রাথমিকদিকে এখানে যোগাযোগ করতেন। পরবর্তীতে তা বি এল এফ পূর্বাঞ্চলীয়
সেক্টরের প্রধান অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সবশেষে শেখ ফজলুল হক মণির প্রধান দফতরে পরিণত হয়।
৪নং প্রিন্সেস স্ট্রিট:
ছাত্রলীগের ছেলেদের অস্থায়ী আস্তানা ছিল এটি। পরে এ অবস্থান পরিবর্তন করে আনন্দ মোহন পার্কের
একটি বাড়িতে চলে যান ছাত্রলীগ নেতারা।
আগরতলা কলেজ টিলা:
চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ এক অংশের নেতাদের অবস্থান ছিল এ টিলায়। এখানে থাকতেন বিধান কৃষ্ণ সেন, এন
জি মাহমুদ কামাল, আবু তালেব চৌধুরী, মানিক চৌধুরী, রহমতউল্লাহ চৌধুরী, আলী আজম প্রমূখ।
বাঁধারঘাট গ্লাস ফ্যাক্টরী:
এটা ছিল বি এল এফ পূর্বাঞ্চলীয় জোনের অন্যতম প্রধান কার্যালয়।

আসামের নাসিমপুর:
এখানে গোয়েন্দা ট্রেনিং হত। এখান হতে ট্রেনিং নিয়ে মাহবুবুল আলম, ইসমাইল, আলমগীর, শাহাবুদ্দিন, গোলাম
রসুল প্রমূখ সিলেটে ঢুকেছিলেন তথ্য সংগ্রহের জন্য, পরে পালাটোনাতে ট্রেনিং নিয়ে চট্টগ্রামে আসেন।
লায়ালপুর ক্যান্টনমেন্ট ট্রেনিং ক্যাম্প:
প্রশিক্ষক-মেজর রাওয়াত।
সীতাকুন্ডের আব্দুর রাজ্জাকসহ অনেকে এখানে ট্রেনিং নেন।
ঋষ্টমুখ ক্যাম্প:
এখানে ছিলেন ওবায়দুল্লাহ মজুমদার এম পি, বিসমিল্লাহ মিয়া এম পি, এডঃ আবদূর রব। কাজী সিরাজ কিছুদিন এ
ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি জানান, ” এ ক্যাম্পে একবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল।” ওবায়দুল্লাহ
মজুমদার পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করলে ক্যাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
পানছড়ি ক্যাম্প:
এখানে ট্রেনিং নেন শেখ মোঃ ইবরাহিম, নুরুল হক, নুরুন্নবী চৌধুরী প্রমূখ।
তেফানিয়া ক্যাম্প:
এটা ছিল বি এল এফ এর ট্রানজিট ক্যাম্প। এটি পরিচালনা করত ভারতীয় বি এস এফ। এখান হতে যোদ্ধারা
শ্রীনগর ও নওকাবাজার নিয়ে দেশে ঢুকতেন। এখানে ছিলেন মণিরুজ্জামান মন্টু, এম এম ফজলুল হক, রশ্নি,
রশীদ প্রমূখ।
মনু ক্যাম্প:
এখানে ছিলেন কাজী সিরাজসহ অনেকে।
পালাটোনা ট্রেনিং ক্যাম্প:
এখানে প্রথমে এফ এফ যোদ্ধাদের ট্রেনিং হত। নভেম্বরের দিকে বি এল এফ হতে কিছু ইনস্ট্রাক্টর (প্রায়
১০জন) এখানে নিয়োগ করা হয়। জাহাঙ্গীর আলমসহ চট্টগ্রামের অনেকেই এখানে ট্রেনিং নিয়েছেন।
এছাড়াও মেলানগর ক্যাম্প, শালনগর ক্যাম্প, শিলাছড়া ক্যাম্প, আগরতলা কংগ্রেস ভবন, নরসিংগর, বেলতলী,
মোহনপুর, কমলাপুর ট্রেনিং ও ট্রানজিট ক্যাম্পে চট্টগ্রামের যোদ্ধারা থাকতেন ও প্রশিক্ষণ নিতেন।
ভারতের এসব ক্যাম্প হতে সেনাবাহিনীতেও রিক্রুট হত। কমিশন রেঙ্কে ছাত্রদের ও সিপাই হিসেবে
বাপকসংখ্যক শ্রমিককে এসব কাম্প হতে রিক্রুট করা হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে।
পৃষ্ঠা: ৩৩৮-৩৪১
বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম

ডাঃ মাহফুজুর রহমান
প্রকাশ – ১৯৯৩)
আগামী কাল মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম – ১৭ – বি এল এফ।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার – দেওয়ান মাবুদ আহমেদ ।

বি দ্র–ডিজাইন এবং আপগ্রেডেশনের কারনে লেখা টি দুই দিন বন্ধ ছিল ।এখন থেকে প্রতিদিন এই লেখা প্রকাশিত হবে ।

——
# আপনাদের আরো পড়ার সুবিধার্থে আমাদের hellojanata APP ডাউন লোড করে নিন গুগল প্লে থেকে ।
Android Apps Link:-

https://play.google.com/store/apps/details?id=hello.janata&hl=en&gl=US
———–
এই পোর্টালে যারা লিখে্ন নিয়মিত —

# পড়ুন #

# প্রতিদিন— “বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম -লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ মাহফুজুর রহমান”।
# বুধবার— “ভ্রমন”পড়ুন।। লেখক মুহাম্মদ মনসুরুল আজম , খসরু খান এবং অন্যান্য লেখক রা লিখেন এ খানে — । ~~~
# বৃহস্পতিবার — শুক্রবারের রান্নাঘর প্রকাশিত হয় বৃহস্পতিবার –লিখেন ফিরোজা বেগম লুনা । ~~~~
# শুক্র বার— ” বৈমানিকের পাণ্ডুলিপি” লিখেন বাঙ্গালি বৈমানিক”রেহমান রুদ্র”।”
# শনিবার—আমেরিকার বাল্টিমোর থেকে ধারাবাহিক লিখেন লেখক আবদুল হাকিম। তিনি লিখবেন তাঁর নিজস্ব বানান রীতিতে । প্রতি শনিবার ।
# রবিবার— ” রবিবাসরীয় কবিতা” পাবেন প্রতি রবিবার । এখানে লেখক মাহবুবা ছন্দা, তাসলিম_তামিম, মেহের সরকার নিয়মিত লেখেন আর লিখবেন ।
# কলামিস্ট ও লেখক দেওয়ান মাবুদ আহমেদ লিখেন এখানে হরহামেশাই ।
# সাহিত্য পেজে পাবেন প্রখ্যাত লেখক এবং সাংবাদিক,সংগঠক দন্ত্যস রওশন এর নতুন অনুকাব্য । ~~~
# সামনেই যে লেখকরা তাঁদের লেখা আমাদের এখানে নিয়মিত দেবেন বলে কথা দিয়েছেন তাঁরা হলেন — মঈন বিন নাসির- একটি প্রকাশিত, নন্দিনী সাবরিনা খান (কানাডা থেকে)। আমরা তাঁদের স্বাগত জানাই ।

# একটি হ্যালোজনতা প্রেজেন্টেশন #

।। হ্যালো জনতা.কম ।।

নুপুর ।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here