“প্রতিরোধ যুদ্ধে চট্টগ্রাম – ১৯ “লিখছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ মাহফুজুর রহমান।।

0
57

বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম–
ভারতে বিভিন্নভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পেশার লোক যারা জড়িত ছিলেন:

সরাসরি যুক্ত কার্যক্রমের বাইরেও ব্যাপক কাজ হয়েছে ভারতে। চট্টগ্রামের জড়িত ব্যক্তিদের একাংশের কাজের বিবরণ-

পত্রিকা:
দেশ বাংলা-পত্রিকা বের করতেন ফেরদৌস আহমদ কোরেশী। জড়িত ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী, দীপক সেন, আবু জাফর, সেলিম প্রমূখ।
সাপ্তাহিক অমর বাংলা – পার্থ প্রতিম বড়ুয়া (জেল রোড) বের করতেন। তার সহকারী হিসেবে ছিলেন মরহুম আবু বকর সিদ্দিকী।
যুদ্ধের ফটো তোলার কাজে ছিলেন অমলেন্দু বিশ্বাস।

নার্সিং:
ভারতের বিভিন্ন স্থানে নার্সিং এ বেগম আইভি রহমান, বেগম জাহানারা হক, হাসিনা আহমদ, প্রমূখের সাথে ছিলেন চট্টগ্রামের নুরুন্নাহার জহুর, বেগম হোসনে আরা মান্নান, ফরিদা আখতার প্রমূখ।

প্রশাসনিক:
ভারতে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনিক কাঠামো ছিলো। সেখানে বাংলাদেশের অনেকেই কর্মরত ছিলেন।

হাসপাতাল:
ভারতে চট্টগ্রামের যে সব চিকিৎসক বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা কাজে জড়িত ছিলেন তারা হলেন, ডাঃ অজিত কুমার নাথ (চকবাজার), ডাঃ কালিপদ পালিত, ডাঃ অজিত চৌধুরী, ডাঃ কামরুজ্জামান, ডাঃ মেজর সরোজ খাস্তগীর, ডাঃ শাহাবুদ্দিন মাহমুদ, ডাঃ বেলায়েত হোসেন, ডাঃ আশীষ সরকার, ডাঃ অসিত বরণ দাশ (নোয়াপাড়া), ডাঃ রেজা, ডাঃ সমীর কুমার দাশগুপ্ত, ডাঃ ললিত কুমার দত্ত প্রমূখ। বিভিন্ন ক্যাম্পে বেশ কিছু ডাক্তার জড়িত ছিলেন যা অন্যত্র বলা হয়েছে।

বেতারের বৈদেশিক প্রচার বুলেটিনের অন্যতম দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক মোঃ খালেদ। মুক্ত এলাকার গণশিক্ষা কমিটির দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক মোঃ খালেদ ও মাহবুব আলম চাষী।

ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ:
ভারতীয় সেনা ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সাথে বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়াররা জড়িত হয়েছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে এরা ব্রীজ খোলা, ব্রীজ উড়ান ইত্যাদি কাজে অংশ নিতেন। রাউজান বিদ্যুৎ অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী (১৯৯০ সাল) জাফর আহমদ ভারতীয় সেনাদের সাথে এ জাতীয় কাজে অংশ নিয়েছেন।

ভারতে পরিচয় পত্র ইস্যু:
ভারত সরকার শরণার্থী বা যোদ্ধাদের পরিচয়ে যাতে পাক অনুচর প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য পরিচয় পত্র ইস্যু করার ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধি ভারতের যে কোন থানায় কাউকে পরিচয় করিয়ে দিলে সে থানা হতে পরিচয় পত্র ইস্যু করা হত। সাবরুম ক্যাম্পের এ জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছেন আয়ুব বাঙালি, নুরুর আলম মাস্টার, হুমায়ুন কবির প্রমূখ।

ড্রাইভার:
মেজর রফিকের গাড়ী চালাতেন মোঃ সেলিম। যুদ্ধে এর অবদান ও কম নয়।

বুদ্ধিজীবীদের কাজ:
ডঃ এ আর মল্লিক, সৈয়দ আলী আহসানের সাথে আরো অনেক ব্যক্তিত্ব ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবদান রেখেছেন।
ভঃ শামসুল আলম সাঈদ (মিরশ্বরাই) ভারতে পৌঁছে কিছুদিন স্ক্রিপ্ট লেখেন বেতারে। পরে বাংলাদেশ সহায়ক সমিতির দিলীপ চক্রবর্তীকে প্রবাসী শিক্ষকদের তালিকা তৈরীতে সহায়তা করেন ও সমিতির দফতর সম্পাদক হন। পরে ডঃ মাযহারুল ইসলাম, ডঃ অজয় রায়ের সাথে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ সফর করেন। ডঃ সাঈদ তার সাক্ষাৎকারে জানান, ভুপালের মুসলমানরা মনে করত বাংলাদেশে মুসলমান নেই। তাদের মাঝে কাজ করার পর সে ভুলের অবসান হয়। এরপর জনাব সাঈদ ধজ্বনগর যুব শিবিরে ও সবশেষে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে কাজ করেন। এর আগে তিনি কেনেডীর সাথে যে টিম দেখা করে তার সদস্য ছিলেন। পরে তিনি পাতিয়ালাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরি নেন। বুদ্ধিজীবীরা প্রায় সবাই পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার অথবা ভারত সরকারের অধীনে চাকুরি নিয়ে যুদ্ধে যথাসম্ভব সহায়তা করেছেন।

চট্টগ্রাম সেক্টরের সাংবাদিক হিসাবে ছিলেন আবুল মনজুর।

পুলিশ এস পি ছিলেন এস আই তালুকদার, পাঃ চট্টগ্রামে এস পি ছিলেন বিমলেশ্বর দেওয়ান। চট্টগ্রাম রেল এস পি হন মোঃ ইবরাহিম।

চট্টগ্রামের যেসব শিল্পীরা ভারতে বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন তারা হলেন- শেফালী ঘোষ, প্রবাল চৌধুরী, কবরী চেীধুরী (সরওয়ার), মিহির লালা, জয়ন্তী লালা, উমানন্দী প্রমূখ। একই সাথে ছিলেন মাহমুদুর রহমান, মিহির নন্দী, ডাঃ সানজিদা খাতুন, মৃনাল কান্তি ভট্টাচার্য, শাহীন মাহমুদ, ডালিয়া নাওশীন, সুজিত রায়, রানী প্রভা চৌধুরী, চিত্তরঞ্জন ভুঁইয়া, ছন্দা ভুঁইয়া, লায়লা জামান, মনজুরা দাস গুপ্তা, ফ্লোরা হকসহ অনেকে। মিহির লালা রাজশাহী হতে যোগ দেন এ দলের সাথে। এ দলটি ভারতের বিভিন্ন স্থানে, সীমান্তবর্তী সেক্টর সমূহে গান গেয়ে জনমত সংগঠিত করতেন ও যোদ্ধাদের উৎসাহ জোগাতেন।

আগরতলায় স্থাপিত ৫ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারের দায়িত্বে ছিলেন প্রফেসর মোঃ খালেদ। পরে বেতার কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে কোলকাতায় স্থাপিত হয়।

এম আর সিদ্দিকী ওয়াশিংটনে দূত হিসেবে কাজ করেছেন। আখতারুজ্জামান বাবু কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন দফতর হতে আমেরিকা ও দূরপ্রাচো প্রতিনিধি নিযুক্ত হন।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে:
চট্টগ্রামের আখতারুজ্জামান চৌধুরী ভারতে গিয়ে মারাঠী সম্প্রদায়ের নেতা কালাশাহ, ধাধরের সাথে দেখা করে এ সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের পক্ষে আনতে সহায়তা করেন। কিছুদিন পর তিনি আমেরিকা ও লন্ডনে যান। লন্ডনে সাংবাদিক সম্মেলন করেন ও ১৭টি জনসভায় বক্তব্য দেন। আবু সাঈদ চৌধুরীকে তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। জনসভার মাঝে উল্লেখযোগ্য জনসভা হয়েছিল হাইডপার্কে যেখানে বক্তব্য দিয়েছিলেন আবু সাঈদ চৌধুরী, ফনিভূষণ মজুমদার ও বাবু মিয়া জনসভা শেষে মিছিল করে লন্ডনের ক্লারিজেস হোটেলে অবস্থানরত মিসেস গান্ধীকে স্বারকলিপি দেয়া হয়। আমেরিকাতে আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে বিভিন্ন মহলের সাথে যোগাযোগ ও নানা কাজে জড়িত ছিলেন জনাব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। তিনি আরো জানান বাংলাদেশের গণহত্যা বন্ধ করার জন্যে তিনি সরাসরি মিসেস নিক্সনের সাথে দেখা করেছিলেন যদিও মিসেস নিক্সন এ ব্যাপারে কোন সন্তোষজনক জবাব দেন নি। লন্ডনের সিলেট অধিবাসীদের মাহমুদ আলী একটি ধারণা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের সব স্বাভাবিক চলছে। ফলে লন্ডনের বৃহত্তর এক জনগোষ্ঠি চুপ ছিল। বাঙালি প্রতিনিধিরা গিয়ে সিলেটবাসীদের এ ভুল ভেঙ্গে দিলে তারা বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় হয়।

আলকরণের আবেদীন পরিবারের দু’ সদস্য (পূর্বে উল্লেখিত) নজমুল আবেদীন ও তার স্ত্রী লন্ডনে যুদ্ধের সময় গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন।

মন্তব্য:
ভারতে অবস্থানরত যোদ্ধা ও ক্যাম্পের বিবরণ দলিলে মোটামুটিভাবে রয়েছে। এখানে দলিল ও সাক্ষাৎকার হতে কিছু কথা দেয়া হল যা একান্তই আংশিক। আংশিক তথ্যাদি হতে যেসব সত্য বেরিয়ে আসে তাহল-
ভারতে প্রাথমিক দিকে সব ধরণের অর্থাৎ সর্বদলীয়-নির্দলীয় যোদ্ধারা গেলেও কিছুদিনের মাঝেই দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে এ নিয়ন্ত্রণ নেয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন সমূহ। পরে রুশপন্থীরা আলাদা ক্যাম্প করে ট্রেনিং নেয়। চীনাপন্থীদের একটি ক্যাম্প চালু হলেও তা বন্ধ হয়ে গিয়ে অন্য একটি ক্যাম্প চালু হয়।

সব দলই দলীয়ভাবে ট্রেনিং এর চেষ্টা করেছে শুরুতেই। কেউ সফল হতে পেরেছে, কেউ পারেনি। তবে রাজনৈতিক কর্মীরা রাজনৈতিক বাহিনীতে থাকতে বেশী পছন্দ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। বি এল এফ গঠন নিয়ে সেনাবাহিনী ও আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ ছিল।

বি এল এফ এর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সে সময়ে প্রকট হতে থাকে, এরই ফলশ্রুতিতে অনেকে নিহত হন। তবে নেতৃত্বের বিচক্ষণতার কারণে তা যুদ্ধকে প্রভাবিত করতে পারেনি। বি এল এফ বামপন্থীদের কোন দ্বন্দ্ব দেখা যায়নি- বরং বি এল এফ-বি এল এফ দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা গেছে।

ক্যাম্পগুলোর পরিচালনা হত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সব করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশ সরকার সীমিত শক্তি নিয়েই তার প্রশাসন দক্ষতার সাথে চালাতে চেষ্টা করেছে। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে থাকতে হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। কিন্তু এ নিয়ে কারো কোন ক্ষোভ তেমন ছিলনা। কারণ একটিই- উগ্র দেশপ্রেম। আমাদের পেশাজীবি, রাজনীতিবিদ, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তাদের সাধ্যমত যুদ্ধে অবদান রাখতে চেষ্টা করেছেন যা যুদ্ধের গণচরিত্রকে প্রকাশ করে।

পৃষ্ঠা: ৩৪৫-৩৪৬
বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম
ডাঃ মাহফুজুর রহমান

প্রকাশ – ১৯৯৩
কৃতজ্ঞতা – দেওয়ান মাবুদ আহমেদ ।।

# আগামী কাল মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহর- প্রাথমিক সূত্রপাত ও শহর কমান্ড: ।।

—-
# আপনাদের আরো পড়ার সুবিধার্থে আমাদের hellojanata APP ডাউন লোড করে নিন গুগল প্লে থেকে ।
Android Apps Link:-

https://play.google.com/store/apps/details?id=hello.janata&hl=en&gl=US
———–
এই পোর্টালে যারা লিখে্ন নিয়মিত —

# পড়ুন #

# প্রতিদিন— “বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম -লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ মাহফুজুর রহমান”।
# বুধবার— “ভ্রমন”পড়ুন।। লেখক মুহাম্মদ মনসুরুল আজম , খসরু খান এবং অন্যান্য লেখক রা লিখেন এ খানে — । ~~~
# বৃহস্পতিবার — শুক্রবারের রান্নাঘর প্রকাশিত হয় বৃহস্পতিবার –লিখেন ফিরোজা বেগম লুনা । ~~~~
# শুক্র বার— ” বৈমানিকের পাণ্ডুলিপি” লিখেন বাঙ্গালি বৈমানিক”রেহমান রুদ্র”।”
# শনিবার—আমেরিকার বাল্টিমোর থেকে ধারাবাহিক লিখেন লেখক আবদুল হাকিম। তিনি লিখবেন তাঁর নিজস্ব বানান রীতিতে । প্রতি শনিবার ।
# রবিবার— ” রবিবাসরীয় কবিতা” পাবেন প্রতি রবিবার । এখানে লেখক মাহবুবা ছন্দা, তাসলিম_তামিম, মেহের সরকার নিয়মিত লেখেন আর লিখবেন ।
# কলামিস্ট ও লেখক দেওয়ান মাবুদ আহমেদ লিখেন এখানে হরহামেশাই ।
# সাহিত্য পেজে পাবেন প্রখ্যাত লেখক এবং সাংবাদিক,সংগঠক দন্ত্যস রওশন এর নতুন অনুকাব্য । ~~~
# সামনেই যে লেখকরা তাঁদের লেখা আমাদের এখানে নিয়মিত দেবেন বলে কথা দিয়েছেন তাঁরা হলেন — মঈন বিন নাসির-(প্রকাশিত)
,
নন্দিনী সাবরিনা খান (কানাডা থেকে)তিনি লিখবেন প্রতি মঙ্গলবার —

হ্যালো জনতা ডট কম তাঁর লেখা লেখির ভুবনে তাঁদের স্বাগতম জানাচ্ছে।

# একটি হ্যালোজনতা প্রেজেন্টেশন #

।। হ্যালো জনতা.কম ।।

বলাই ।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here