Life:৭২ থেকে ২২,জীবন বহমান-এক – ফুলছড়ি ঘাট টু বাহাদুরাবাদ ঘাট । মুসা কামাল (এম কে)।

0
91

# আর মাত্র চার দিন ।#


# তাহাঁদের কথা । #
# ফিচার গ্রুপ পোস্ট –#

৭২ থেকে ২২–
জীবন বহমান –
ফুলছড়ি ঘাট টু বাহাদুরাবাদ ঘাট ।
মুসা কামাল (এম কে)।

১৯৭২ সাল । কেবল দেশ স্বাধীন হয়েছে ।
মনের মাঝে স্বাধীন দেশের স্বাধীনতার উচ্ছাস । যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা হয়েছে । বিতারিত হয়েছে পৃথিবীর নামকরা বলে খ্যাত পাকিস্তান সেনা বাহিনী ।

আমরা ছোট্ট তখন । কৈশোর পেরিয়ে কেবল তরুন বয়স । সে সময়ের ছোট্ট মহকুমা শহর কুড়িগ্রামে থাকি । ১৬ই ডিসেম্বরের পরে রাতে আর মুক্তি বাহিনীর গুলির প্রতিক্ষা করি না ।

# সে হারাল কোথায় কোন দূর অজানায়-নাম না জানা এক মুক্তিযোদ্ধা #

এর আগে পুরো ৭১ সাল জুড়েই তো প্রতিরাতে মুক্তিবাহিনী আর পাকিস্তান বাহিনীর গোলাগুলির আওয়াজ নৈমিত্তিক বিষয় ছিল । কোন রাতে গোলাগুলি না হলেই বরঞ্চ আমরা চিন্তিত হয়ে পরতাম ! কি হল আমাদের মুক্তিদের– ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরতাম । কাছে , দূরে , অনেক দূরে- কখনো প্রচণ্ড বা দূরে ক্ষীণ গুলির শব্দ পেলেই জেগে উঠতাম । আরে এসে গেছে আমাদের মুক্তিরা !

আমাদের খালারা থাকেন ঢাকায় । গত নয় মাস তাদের কোন খোঁজ খবর জানি না। আব্বা আম্মা আলাপ করেন – ঢাকা যেতে হবে ।

মন আনন্দে নেচে উঠে ।স্বাধীন দেশের ঢাকায় যেতে হবে , দেখবো আমাদের রাজধানী । বিষয়টি আলাদা অনুভুতি জাগায় ।
যেতে তো কোনই অসুবিধা নেই । এ দেশ আমাদের । পথে ঘাটে আর ডান্টি কার্ড ( শান্তি কমিটি সে সময় আইডেন্টি কার্ড ইস্যু করেছিল,যারা পাকিস্তান চায় তাদের নিরাপত্তার জন্য) পাকিস্তানী সৈন্যরা সেই ডান্টি কার্ড পথে ঘাটে চেক করতো বলত- ডান্টি কার্ড নিকালো । ডান্টি কার্ড দেখাও । তারপরেও সন্দেহ হলে ধরে নিয়ে যেত তাদের ক্যাম্পে । একবার গেলে আর ফেরত আসা সম্ভব ছিলই না ।

এখন সে সমস্যা দূর হয়ে গেছে । তাহলে হবে কি ? পথ ঘাট ভাঙ্গা চোরা । ব্রিজ কার্লভারট নেই বললেই চলে । বড় বড় ব্রিজ গুলো পাকিস্তান সৈন্যরা পালাবার পথে ভেঙ্গে দিয়ে গেছে আবার মুক্তি বাহিনী পাকিস্তানীদের আক্রমন আর ব্যতিব্যস্ত করতে ছোট ছোট পুল, কার্লভারট উড়িয়ে দিয়েছে । ফলে চলাচলে বেজায় অসুবিধা ।
কুড়িগ্রাম থেকে রংপুর বা কাউনিয়া জংশনের দিকে যেতে পথে পরে তিস্তা ব্রিজ । ব্রিটিশ আমলে তৈরি । পাকিস্তান সেনারা রংপুরের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সেই ব্রিজের কাউনিয়ার দিকে প্রথম স্লাবটি ডিনামাইট মেরে উড়িয়ে দিয়েছে ।
সে সময় তিস্তা নদী অনেক খরস্রোতা ছিল ।ট্রেনে করে তিস্তা যেয়ে কিছুটা হেটে নৌকায় নদী পার হয়ে ওপারে কাউনিয়ার দিকে উঠে ট্রেন ধরতে হত ।
পরিবার পরিজন নিয়ে সে সময় চলাফেরা কঠিন অনেক । সারা দেশেই তো পরিস্থিতি একই রকম । বাংলদেশের সে সময়ের সবচেয়ে বড় ব্রিজ ছিল পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ । ব্রিটিশ সময়ে তৈরি ।পাকিস্তানি সেনারা যখন ভেড়ামারা থেকে পাবনার দিকে পালাতে শুরু করে, তখন পদ্মা রেলওয়ে ব্রিজের ভেড়ামারা’র দিকে ডিনামাইট মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল হার্ডিঞ্জ ব্রিজের প্রথম স্ল্যাব টি ।
জীবন তখন অনেক কঠিন । সকলেরই !

আমাদের ঢাকা যাওয়ার আশার সূর্য অস্তমিত প্রায় । কিন্তু মাস খানেক যেতে না যেতেই মনের মাঝে হাওয়া বয় উথাল পাথাল । আমরা যাচ্ছি ঢাকা । রাস্তার এমন অবস্থা – কি ভাবে যাবো ? চার ভাই বোন আলোচনায় বসে পরি । কোনই কুল কিনারা পাই না ।

আম্মা হেসে বলেন আমরা যাবো ট্রেনে -ফুলছড়ি ঘাট-বাহাদুরাবাদ- হয়ে । সে সময় এই পথ টি ছিল , বলতে গেলে একমাত্র সহায় । কাউনিয়া – গাইবান্ধা , বোনার পাড়া হয়ে যমুনার দিকে যাত্রা । সে সময় ফুলছড়ি ঘাট স্টেশনকে আবার তিস্তামুখ ঘাট নামেও ডাকা হত । হাঁ , ট্রেন এ চড়ে যেতে হতো। বাসে ঢাকা যাওয়ার কোন ব্যবস্থাই সে সময় ছিল না। বলা চলে এ সময় কালে দেশে বাস সার্ভিস ছিলই না ।পাকিস্তান সময়ে এ দেশের উন্নতি করে নাই সরকার। একাত্তুরের পূর্বে হয়তবা ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাওয়া যেত । তাও আবার ছিল এক লেনের রাস্তা । ভাঙ্গা চুড়া জরাজীর্ণ । আর যে সময়ের কথা বলছি সেই সময় তো এক যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ । কাজেই বাই রোডে ঢাকা যাওয়া অসম্ভব প্রায় ।

তখন যমুনা নদীর পথে কাউনিয়া- গাইবান্ধা- বোনার পাড়া হয়ে ফুলছড়ি ঘাট স্টেশনে যেয়ে ট্রেন ছেড়ে দিয়ে স্টিমারে ( স্টিম ইঞ্জিন ) যমুনা পার হয়ে ওদিকে বাহাদুরাবাদ ঘাট থেকে আবার ঢাকা মুখী ট্রেন ধরতে হত ।

# স্টিমার- স্টিম ইঞ্জিন।

সে সময় ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে সবার আগে আগে স্টিমারের দিকে যেতে হত । রেল পথ থেকে সামনে বেশ অনেকটাই বালু চরের মত এলাকা । তারপর ঘাটে স্টিমার । আমি আর আমার ছোট ভাইটি ( কোয়েল ) ছুটতাম । হাতে বিছানার চাদর । দৌড়ে যেয়ে স্টিমারে বেশ কিছু জায়গা দেখে নিয়ে চাদর বিছিয়ে দেওয়া আমাদের কাজ । বসার স্থান দখল করা আর কি ! এরপর আব্বা , আম্মা ,সব ছোট ভাই ( কেনেডি ) আর বড় বোন ( পিয়াল) এসে পৌঁছালে , কিছুটা থিতু হয়ে আম্মার টিফিন ক্যারিয়ারে বয়ে আনা ভাত , সবজি আর মুরগির মাংস বা মাছ ভক্ষন ।

এরপর কিছুটা রেস্ট । এদিক ওদিক ঘুড়াঘুড়ি । যমুনা দর্শন । এরপর আবার প্রস্তুতি । আবার দৌড়ের প্রস্তুতি । এবার বাহাদুরাবাদ ঘাট স্টেশনে যেয়ে ট্রেন এ জায়গা দখল করতে হবে !


# বাহাদুরাবাদ স্টেশন বা ফুলছড়ি ঘাট স্টেশন – ছবি গুলো সংগ্রহ ।

স্টিমার থামতেই দৌড়াতে হতো । সবাই দৌড়াচ্ছে ,আমরা দুই ভাইও তাই । বাহাদুরাবাদ ঘাট থেকে ট্রেন স্টেশন বেশ দূরে ছিল । কিন্তু আমাদের বসার জায়গা দখল নিয়ে কথা । দখলও করতাম । এরপর ট্রেন ছাড়লে ঢাকার পথে রওনা । সাধারনত স্টিমার ঘাটের এই পর্ব টা সবসময়ই শেষ রাতের দিকে হত বলেই মনে আছে । ফলে বিশ্রাম নিতে নিতে ঘুমিয়ে পরতাম। ঘুম ভাঙত শ্রীপুরের দিকে এসে । আব্বা নিচে প্লাটফর্ম থেকে সাগর কলা কিনে আনতেন । মনে আছে অনেক হৃষ্ট পুষ্ট বড় বড় সাগর কলা ছিল ওদিকটায় ।
এখন আর চোখে দেখি না সে ধরনের কলা । বাজারে চাইলেও পাওয়া দুস্কর । হয়তবা ঢাকার কোন বাজারে পাওয়া যেতে পারে ।জানি না – হয়তবা প্রচুর দামে বিকোয় সে কলা ।

তবে শুনেছি নরসিংদীর মনোহরদিতে অমন কলার চাষ হয় । শুনেছি , দেখি নাই । আর রেল লাইনের গতিপথ গেছে বদলে । কাজেই না আছে শ্রীপুর স্টেশন না আছে সেই কলা।
এখন বাজারে নেপালি সাগর কলা ।
সেই পঞ্চাশ বৎসর আগের কলা খাওয়া মানুষের কি আর নেপালি কলাতে মন ভরে ।তবুও খাই । খেতেই হয় !

এভাবেই স্বাধীন দেশের জীবন শুরু। তবে বড় পিছিয়ে পড়া এক জীবন ছিল সেটি । অথচ এখনো সেই জীবন বহমান। আজো এই ২০২২ তে ।
( ৭২ থেকে ২২- ২ দেখুন আগামী কাল । ফিচার গ্রুপ পোস্টে লক্ষ্য রাখুন ।)

হ্যালো জনতা ডট কম ।
hellojanata.com .
# এখানে প্রকাশিত অধিকাংশ অকৃত্রিম লেখা আমাদের ব্লগে নিয়মিত সম্প্রসারিত হয় ।
কাজেই লেখা ডিলিটের কারনে লেখা এখানে না পেলে ব্লগে পাবেন । ‘ তাহাঁদের কথা ‘ এর সবগুলো লেখাই আমাদের ব্লগে থাকবে ।
হ্যালো জনতার ব্লগ সাবস্ক্রাইব করুন।।
কপি অ্যান্ড পেস্ট টু ইওর ব্রাউসার ।
https://hellojanata350.blogspot.com–

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here